খুলনা প্রেসক্লাবে হামলার ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, এটি আমাদের সাংবাদিকতা, গণতন্ত্র এবং নাগরিক নিরাপত্তার ওপর ক্রমবর্ধমান হুমকির এক নগ্ন প্রকাশ। গতকাল রবিবার সন্ধ্যার এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল, সংবাদপত্রের কালি এখন আর শুধু সত্য লিখে না, তা রক্তের দাগেও রঞ্জিত হতে পারে।
প্রেসক্লাব, নামটির মধ্যেই একটি মর্যাদা, একটি নিরাপদ আশ্রয়ের ধারণা নিহিত। যেখানে মতের ভিন্নতা থাকবে, বিতর্ক হবে, তর্ক হবে, কিন্তু সহিংসতা নয়। অথচ সেই জায়গাতেই যখন দুর্বৃত্তরা ঢুকে সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায়, তখন প্রশ্ন জাগে, আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? এই সমাজ কি আর যুক্তি, বিবেক ও সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে নেই?
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। প্রেসক্লাবের নির্বাচনি পরিবেশকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা থাকলেও তা কখনোই সহিংসতায় রূপ নেওয়ার কথা নয়। কিন্তু একদল সন্ত্রাসী হঠাৎ ঢুকে তর্ক জুড়ে দেয়, গালিগালাজ করে এবং নির্দিষ্ট একজন সভাপতি প্রার্থী, সাংবাদিক মোস্তফা সরোয়ারের নাম ধরে আক্রমণাত্মক আচরণ করে। এর মধ্যেই এখন টেলিভিশনের প্রতিনিধি তরিকুল ইসলামের ওপর শারীরিক হামলা চালানো হয়। এটি কোনো আকস্মিক উত্তেজনা নয়, এটি ছিল স্পষ্ট বার্তা দেওয়ার চেষ্টা, চুপ থাকো, না হলে এর চেয়েও খারাপ হবে।
এখানেই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। কারণ সাংবাদিকদের ওপর হামলা মানে শুধু একজন ব্যক্তিকে আঘাত করা নয়, এটি একটি প্রতিষ্ঠানের কণ্ঠরোধ করার চেষ্টা। এটি সেই কলমের ওপর আঘাত, যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলে। এটি সেই চোখের ওপর আঘাত, যা সত্যকে দেখে এবং দেখায়। হামলার পর সাংবাদিকদের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ, এটি স্বাভাবিক এবং যৌক্তিক। কারণ যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আগে থেকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তখন প্রতিবাদই হয়ে ওঠে একমাত্র ভাষা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন বারবার সাংবাদিকদেরই রাস্তায় নামতে হচ্ছে নিজেদের নিরাপত্তার দাবিতে?
খুলনার সাংবাদিক সমাজ এক সময় ছিল সাহস, ঐক্য এবং নির্ভীকতার প্রতীক। এখানকার সাংবাদিকরা ক্ষমতার কাছে মাথা নত করেননি, কোনো গডফাদারের সামনে আপোশ করেননি। সত্য বলার জন্য তারা হুমকি পেয়েছেন, কিন্তু থামেননি। সেই ঐতিহ্য আজ কোথায়? আজ কেন কয়েকজন ছিঁচকে সন্ত্রাসী প্রেসক্লাবে ঢুকে হামলা চালানোর সাহস পায়? কয়েকজন ছিঁচকে সন্ত্রাসী সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত হয়েছে। তাদের আটক করে রিমান্ডে নিলে প্রকৃত গডফাদার বা তাদেরকে কারা পাঠিয়েছে, সেই তথ্য বেরিয়ে আসবে। এর উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের দিকেও তাকাতে হবে। সাংবাদিক সমাজ কি আগের মতো ঐক্যবদ্ধ আছে? ব্যক্তিগত স্বার্থ, দলীয় বিভাজন, পেশাগত হিংসা, এসব কী আমাদের দুর্বল করে দেয়নি? যখন আমরা বিভক্ত, তখনই তো দুর্বৃত্তরা সুযোগ পায়।
এই ঘটনার পর অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, বক্তব্য দিয়েছেন, দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। এগুলো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু শুধু বিবৃতি দিয়ে কি পরিস্থিতি বদলাবে? বাস্তবতা হলো, বিচারহীনতার সংস্কৃতি আমাদের সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত। হামলার ঘটনা ঘটে, কিছুদিন আলোচনা হয়, তারপর ধীরে ধীরে সবকিছু স্তিমিত হয়ে যায়। অপরাধীরা থেকে যায় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে, আর সেই সাহসেই তারা আবারও আঘাত হানে।
খুলনা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হকের বক্তব্য যথার্থ, এটি স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর সরাসরি আঘাত। কিন্তু এই আঘাত প্রতিহত করতে হলে শুধু বক্তব্য নয়, কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দোষীদের গ্রেপ্তার করতে হবে। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা ক্ষমতার ছত্রছায়া, কিছুই যেন বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।
একইসঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব, এই বক্তব্য শুধু উচ্চারণ করলেই হবে না, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ যখন রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থাকে, তখনই সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে।
তবে সব দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিলে চলবে না। সাংবাদিক সমাজকেও নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে হবে। প্রেসক্লাব শুধু একটি ভবন নয়, এটি একটি প্রতীক। এই প্রতীকের মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব। মতের অমিল থাকবে, নির্বাচন হবে, প্রতিযোগিতা থাকবে, কিন্তু তা যেন কখনোই বিভাজনে পরিণত না হয়।
আমার নিজের সাংবাদিকতা জীবনের একটি বড় অংশ কেটেছে খুলনায়। এই শহর আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে সত্যের পক্ষে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে ভয়কে অতিক্রম করতে হয়। সেই সময়ে আমরা জানতাম, যদি আমরা এক থাকি, তাহলে কোনো শক্তিই আমাদের দমাতে পারবে না। আমাদের লেখার শক্তি ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। সেই শক্তির সামনে তথাকথিত গডফাদাররাও কেঁপে উঠত।
আজ যখন দেখি, সেই খুলনাতেই সাংবাদিকদের ওপর হামলা হচ্ছে, তখন কষ্ট হয়, ক্ষোভ হয়, লজ্জাও লাগে। কারণ এটি শুধু একটি ঘটনার ব্যর্থতা নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত ব্যর্থতা। তবে এখনও সময় আছে। এই ঘটনাকে যদি আমরা একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে নিতে পারি, তাহলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। সাংবাদিকদের আবারও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে। কারণ বিভক্ত সাংবাদিকতা কখনোই শক্তিশালী হতে পারে না।
এছাড়া, প্রেসক্লাবগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও পুনর্বিবেচনা করা জরুরি। কে ঢুকছে, কেন ঢুকছে, এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার, সিসিটিভি, নিরাপত্তাকর্মী, এসব এখন আর বিলাসিতা নয়, প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, এই ঘটনার বিচার হতে হবে, দ্রুত এবং দৃশ্যমানভাবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের হামলা করার আগে দশবার ভাবতে বাধ্য হয়।
সাংবাদিকতা কোনো সহজ পেশা নয়। এটি ঝুঁকিপূর্ণ, চ্যালেঞ্জিং এবং অনেক সময় বিপজ্জনক। কিন্তু এই পেশার মূল শক্তি হলো, সত্যের প্রতি অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার যদি আমরা ধরে রাখতে পারি, যদি আমরা একসঙ্গে দাঁড়াতে পারি, তাহলে কোনো হামলাই আমাদের থামাতে পারবে না।
খুলনা আজ একটি পরীক্ষার মুখে। এই পরীক্ষায় আমরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাই, সেটিই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের পথ। আমরা কি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাব, নাকি আরও দৃঢ়ভাবে সামনে এগিয়ে যাব?
আমি বিশ্বাস করি, খুলনার সাংবাদিকরা এখনও সেই শক্তি রাখেন। তারা যদি আবারও এক হয়ে দাঁড়ান, তাহলে এই ছিঁচকে সন্ত্রাসীরা লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হবে। কারণ ইতিহাস বলে, সত্যকে সাময়িকভাবে থামানো যায়, কিন্তু চিরতরে দমন করা যায় না।
এখন সময়, কথার নয়, কাজের। সময়, ঐক্যের। সময়, প্রতিরোধের।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

